ব্রেন স্ট্রোক: লক্ষণ, প্রকার, কারণ, রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা

মানুষের শরীরের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয় মস্তিষ্কের মাধ্যমে। আর এই মস্তিষ্ককে সচল রাখতে প্রয়োজন অবিরাম অক্সিজেন এবং পুষ্টি উপাদান, যা রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। কোনো কারণে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে সমস্যা দেখা দিলে রক্তের এই স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই মারাত্মক পরিস্থিতিকে ব্রেন স্ট্রোক (Brain Stroke) বলা হয়। অনেকেই স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাককে এক করে ফেলেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। হার্ট অ্যাটাক হয় হৃদযন্ত্রে, আর স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কে।


ব্রেন স্ট্রোক কত প্রকার? (Types of Brain Stroke)

মস্তিষ্কের রক্তনালীর সমস্যার ওপর ভিত্তি করে স্ট্রোক মূলত তিন প্রকার হয়ে থাকে:

১. ইস্কেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)

এটি সবচেয়ে সাধারণ স্ট্রোক। প্রায় ৮৫% স্ট্রোকই ইস্কেমিক স্ট্রোক হয়ে থাকে। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীর ভেতরে রক্তের জমাট বাঁধা (Blood Clot) বা চর্বি জমে রক্তনালী সরু হয়ে গেলে এই স্ট্রোক হয়। ফলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে রক্ত পৌঁছাতে পারে না।

২. হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke)

এই ধরনের স্ট্রোক তুলনামূলকভাবে বেশি বিপজ্জনক। যখন মস্তিষ্কের কোনো দুর্বল রক্তনালী ফেটে যায় (Rupture) এবং মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, তখন তাকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলে। উচ্চ রক্তচাপ বা অ্যানিউরিজম (Aneurysm) এর প্রধান কারণ।

৩. টিআইএ বা মিনি স্ট্রোক (Transient Ischemic Attack - TIA)

একে সাধারণত "মিনি স্ট্রোক" বলা হয়। এক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ সাময়িকভাবে (কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার জন্য) বন্ধ হয় এবং আবার নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়। কোনো স্থায়ী ক্ষতি না হলেও, এটি ভবিষ্যতে একটি বড় স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ বা সতর্কতা সংকেত।


ব্রেন স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms of Stroke)

স্ট্রোকের লক্ষণ চেনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি অত্যন্ত সহজ সূত্র ব্যবহার করা হয়, যাকে বলা হয় F.A.S.T.

  • F - Face Drooping (মুখের একদিক বেঁকে যাওয়া): রোগীকে হাসতে বলুন। দেখুন মুখের কোনো একদিক ঝুলে যাচ্ছে বা বেঁকে যাচ্ছে কি না।
  • A - Arm Weakness (হাতের দুর্বলতা): রোগীকে দুটি হাত ওপরে তুলতে বলুন। একটি হাত কি দুর্বলতার কারণে নিচে নেমে যাচ্ছে?
  • S - Speech Difficulty (কথা জড়ানো): রোগীকে একটি সহজ বাক্য বলতে বলুন। কথা কি অস্পষ্ট বা জড়ানো শোনাচ্ছে?
  • T - Time to Call Ambulance (দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সময়): ওপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখামাত্র সময় নষ্ট না করে রোগীকে স্ট্রোক সেন্টারে নিয়ে যেতে হবে।

অন্যান্য সাধারণ লক্ষণ:

  • হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা হওয়া (যার কোনো স্পষ্ট কারণ নেই)।
  • শরীরের একদিকের হাত ও পা অবশ বা প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া।
  • হঠাৎ চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া বা ঝাপসা দেখা।
  • হাঁটার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা বা মাথা ঘোরানো।

ব্রেন স্ট্রোক কেন হয়? (Causes & Risk Factors)

স্ট্রোকের পেছনে কিছু নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি কাজ করে।

নিয়ন্ত্রণযোগ্য কারণসমূহ:

  • উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure): স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান কারণ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে রক্তনালী ছিঁড়ে যাওয়ার বা ব্লক হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • ডায়াবেটিস ও স্থূলতা: রক্তে অতিরিক্ত শর্করা এবং শরীরের অতিরিক্ত ওজন রক্তনালীর ক্ষতি করে।
  • উচ্চ কোলেস্টেরল: রক্তে ক্ষতিকর চর্বি বা কোলেস্টেরল জমলে ধমনী সরু হয়ে যায়।
  • ধূমপান ও মদ্যপান: তামাকের নিকোটিন রক্তনালীকে শক্ত ও সরু করে ফেলে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
  • অলস জীবনযাপন: শারীরিক পরিশ্রম না করা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া।

অনিয়ন্ত্রণযোগ্য কারণসমূহ:

  • বয়স: ৫৫ বছর বয়সের পর প্রতি দশকে স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়।
  • বংশগত কারণ: পরিবারে কারও স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি থাকে।
  • লিঙ্গ: পুরুষদের মধ্যে স্ট্রোকের প্রবণতা নারীদের চেয়ে কিছুটা বেশি।

স্ট্রোক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি (Diagnosis)

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক দ্রুত নিশ্চিত হতে চান এটি কোন ধরণের স্ট্রোক। এর জন্য প্রধানত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়:

১. সিটি স্ক্যান (CT Scan): এটি অত্যন্ত দ্রুত করা যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (হেমোরেজিক) হয়েছে নাকি রক্ত চলাচল বন্ধ (ইস্কেমিক) হয়েছে। ২. এমআরআই (MRI): মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর আরও সূক্ষ্ম ও নিখুঁত ছবি পেতে এই পরীক্ষা করা হয়। ৩. ক্যারোটিড আল্ট্রাসাউন্ড: ঘাড়ের ধমনী দিয়ে মস্তিষ্কে ঠিকমতো রক্ত যাচ্ছে কি না তা দেখার জন্য।


ব্রেন স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা (Treatment Options)

স্ট্রোকের চিকিৎসার মূল চাবিকাঠি হলো "টাইম ইজ ব্রেন" (Time is Brain)। স্ট্রোক হওয়ার পর প্রথম ৪.৫ ঘণ্টা সময়কে "গোল্ডেন আওয়ার" বলা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *